রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশের যে স্থান গুলোতে প্রকৃতি তার রূপ মেলে ধরেছে তার মধ্যে অন্যতম নেত্রকোনা জেলার বিরিশিরি। পাহাড় নদী সবুজ গাছপালা সবকিছু মিলেমিশে চমৎকার সুন্দর একটা পরিবেশ। বিরিশিরির কূল ঘেঁষে বয়ে গেছে সোমেশ্বরী নদী, এ নদীর কোথাও বেশ খর স্রোতা আবার কোথাও কোমর সমান পানি। এ নদীর বুক চিরে প্রতিনিয়তো তুলছে খনিজ সম্পদ, কয়লা, পাথর, বালি, কোটি কোটি টাকার ব্যবসা এই নদীকে ঘিরে। কথিত আছে ১২৮০ খ্রিস্টাব্দে সোমেশ্বর পাঠক নামক এক সিদ্ধ পুরুষ কামরূপ কামাক্ষা সহ বিভিন্ন তীর্থ দর্শন শেষে এখানে আসেন এবং এখানকার এক অত্যাচারী গারো রাজার কাছ থেকে এই এলাকাটি দখল করেন। পরে তার সোমেশ্বর নাম অনুসারে এই নদীটির নামকরণ করা হয় সোমেশ্বরী। বিরিশিরি প্রথমে গারো বসতি এলাকা হলেও পরে ধীরে ধীরে অনেক মুসলিম বসতি গড়ে ওঠেছে।
সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে সাড়ে আট কিলোমিটার সামনে এগোলেই, চোখে পড়বে সৌন্দর্যের আরেক নিদর্শন রানীখং টিলা। ১৯১২ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম রানীখং টিলায় স্থাপিত হয় খ্রিস্টান ক্যাথলিক গির্জা। রাণীখং নাম করণের পিছনে ও রয়েছে এক চালচিল্লকর কাহিনী শোনা যায়, এই অঞ্চলে খং রাণী নামক এক রাক্ষস বাস করত, নানা ভাবে অত্যাচার করতো এখানকার আদিবাসীদের উপর, একসময় আদিবাসীরা তার অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে, তাকে হত্যা করে এই অঞ্চলে
শান্তি ফিরিয়ে আনে, সেই থেকে এই এলাকার নাম হয়ে যায় রাণীখং।
এক সময় এই অঞ্চলের অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে ছিল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাণীখং টিলায় স্কুল স্থাপনের পর এলাকার ছেলে মেয়েরা শিক্ষার আলো দেখতে শুরু করেছে, টিলায় চিকিৎসালয় স্থাপন এর পর জীবনযাত্রার অনেকটাই পরিবর্তন ঘটেছে স্থানীয় লোকজনদের। খরস্রোতা পাহাড়ি নদী সোমেশ্বীরির কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা রাণীখং খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্ম পল্লী মিশনটির সন্মুখে বিস্তীর্ণ সাদা সিলিকা বালি, ছোট ছোট সারি সারি টিলা, পাহাড় মিশে গেছে দিগন্ত জুড়ে, পা বাড়ালেই ভারত, এখান থেকেই উপভোগ করা যায় পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি খেলা, নীলিমায় ভেসে যাওয়া বনবিহার। রাণীখং টিলা থেকে দেড় কিলোমিটার এগোলেই দেখা মিলবে সাদা মাটি বেষ্টিত গ্রাম বিজয়পুর, খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ মিলবে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। বিজয়পুরের মূল আকর্ষণ সাদা মাটির পাহার হলেও, এখানে চমৎকার নীল পানির জলাশয় দেখা যায়।
অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়ে সমৃদ্ধ বিজয়পুর। পাহাড়ের পাদদেশে বিভিন্ন রহস্যময় গুহা ও চোখে পড়ে, সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা এসব গুহাতে অবস্থান নিত। সীমান্তপাড়ির পাশে পাহাড়ে ওঠার ব্যবস্থা রয়েছে। এখান থেকে সোমেশ্বরী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বাংলাদেশের মধ্যে প্রকৃতির সম্পদ হিসেবে সাদা মাটির অন্যতম বৃহৎ খনিজ অঞ্চল এটি। ছোট বড় টিলা পাহাড় ও সমতল ভূমি জুড়ে প্রায় ১৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এই খনিজ অঞ্চল।
খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৭ সালে এই অঞ্চলে সাদা মাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লক্ষ ৭০হাজার মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশে ৩০০ বছরের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
১৯৫৭ সাল থেকে এ মাটির উত্তোলন কাজ শুরু করা হয়, দৈনিক প্রায় ৩০০ জন শ্রমিক এ মাটি উত্তোলনের কাজ করেন। বিভিন্ন রঙের মাটি পানি ও প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য মনকে বিমোহিত করে। সাদা, গোলাপী, হলুদ, বেগুনি, খয়েরি, বিভিন্ন রঙের মাটির পাহাড় চোখকে জুড়িয়ে দেয়।
বিজয়পুর এলাকায় বেশিরভাগই বাস করে গারো উপজাতি, এদের প্রধান পেশা কৃষি, তবে কিছু কিছু সরকারী ও বেসরকারী এনজিওতেও কাজ করে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নতশীল দেশ থেকে ছুটে আসে মানুষ নেত্রকোনার এই দৃষ্টিনন্দন জায়গাগুলো একনজর দেখার জন্যে।
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, এটুআই, বিসিসি, ডিওআইসিটি ও বেসিস